ন্যায়মতে ষোড়শ পদার্থ | ন্যায়দর্শন

 ন্যায়মতে ষোড়শ পদার্থ


ন্যায় দর্শনের উদ্দেশ্য হলো ষোলটি পদার্থের তত্ত্বজ্ঞান প্রদান করা। এই ষোলটি পদার্থ হলো- (১) প্রমাণ, (২) প্রমেয়, (৩) সংশয়, (৪) প্রয়োজন, (৫) দৃষ্টান্ত, (৬) সিদ্ধান্ত, (৭) অবয়ব, (৮) তর্ক, (৯) নির্ণয়, (১০) বাদ, (১১) জল্প, (১২) বিতণ্ডা, (১৩) হেত্বাভাস, (১৪) ছল, (১৫) জাতি, (১৬) নিগ্রহস্থান।
ন্যায়সূত্রকার মহর্ষি গৌতম তাঁর ‘ন্যায়সূত্রে’র প্রথম সূত্রেই বলেছেন-  
‘প্রমাণ-প্রমেয়-সংশয়-প্রয়োজন-
দৃষ্টান্ত-সিদ্ধান্তাবয়ব-তর্ক-নির্ণয়-বাদ-জল্প-
বিতন্ডা-হেত্বাভাসচ্ছল-জাতি-নিগ্রহস্থানানাং
তত্ত্বজ্ঞানান্নিঃশ্রেয়সাধিগমঃ।। (ন্যায়সূত্র-১/১/১)।
অর্থাৎ : সেই অর্থাৎ মোক্ষোপযোগী এই ভাব পদার্থেরই প্রকার- প্রমাণ, প্রমেয়, সংশয়, প্রয়োজন, দৃষ্টান্ত, সিদ্ধান্ত, অবয়ব, তর্ক, নির্ণয়, বাদ, জল্প, বিতন্ডা, হেত্বাভাস, ছল, জাতি ও নিগ্রহস্থানের অর্থাৎ এই ষোল প্রকার পদার্থের তত্ত্বজ্ঞানপ্রযুক্ত নিঃশ্রেয়স লাভ হয়।

 .
সাধারণত আমরা পদার্থ বলতে যা বুঝি এখানে পদার্থ অর্থ তা নয়। ন্যায় মতে পদার্থের অর্থ হচ্ছে- ‘পদস্য অর্থঃ পদার্থঃ’। পদের অর্থই হলো পদার্থ। অর্থাৎ, কোন পদ দ্বারা যে অর্থ বা বিষয় নির্দেশিত হয়, তাই পদার্থ। প্রতিটি পদার্থই  জ্ঞেয়, প্রমেয় এবং অভিধেয়। অর্থাৎ যাকে জানা যায়, যার সত্তা আছে এবং যার নামকরণ করা যায়, তাই পদার্থ। ন্যায়দর্শন অনুযায়ী পদার্থগুলির তত্ত্বজ্ঞান জীবের মোক্ষ লাভের জন্য একান্ত প্রয়েজন।
 .
উল্লেখ্য, ন্যায়দর্শন হলো অনিয়ত পদার্থবাদী দর্শন। যে দর্শনে পদার্থের সংখ্যা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি, সেটিই হলো অনিয়তপদার্থবাদী দর্শন। যদিও ন্যায়দর্শনে ষোলটি পদার্থের একটি তালিকা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু পদার্থ ষোলটি একথা বলা হয়নি। মুক্তির উপায় হিসাবে ষোলটি পদার্থের জ্ঞান উপযোগী একথাই কেবল বলা হয়েছে। একারণে ন্যায়দর্শন হলো অনিয়ত পদার্থবাদী দর্শন।
 .
(১) প্রমাণ : ‘প্র’ পূর্বক ‘মা’ ধাতুর উত্তর করণবাচ্যে অনট্ প্রত্যয় দ্বারা প্রমাণ শব্দ নিষ্পন্ন হয়। ‘মা’ ধাতুর অর্থ জ্ঞান। ‘প্র’ উপসর্গের অর্থ প্রকৃষ্ট বা উৎকৃষ্ট। জ্ঞানের পক্ষে উৎকৃষ্টতা হলো ভ্রান্তিশূন্যতা। ‘অনট্’-প্রত্যয়ের অর্থ করণ অর্থাৎ কারণ বিশেষ। যাহার ব্যাপার বা কার্য হলে কর্তা ক্রিয়া নিষ্পন্ন করেন সেই কারণকেই করণ বলা হয়। অর্থাৎ, যে প্রণালী দ্বারা প্রমা বা যথার্থজ্ঞান লাভ করা যায় তাকেই প্রমাণ বলা হয়। ন্যায়মতে যথার্থজ্ঞান চারপ্রকার- প্রত্যক্ষণ, অনুমিতি, উপমিতি এবং শাব্দবোধ। ফলে এই চারপ্রকার যথার্থজ্ঞানের করণ বা প্রমাণও যথাক্রমে চারপ্রকার- প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান এবং শব্দ। ন্যায়সূত্রে বলা হয়েছে-  
‘প্রত্যক্ষানুমানোপমানশব্দাঃ প্রমাণানি’।। (ন্যায়সূত্র-১/১/৩)
অর্থাৎ : প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান ও শব্দ নামে প্রমাণপদার্থ চতুর্বিধ।

কোনো কিছুর প্রকৃত জ্ঞান লাভ করার পদ্ধতিকে প্রমাণ বলা হয়। প্রমাণের মধ্যে আমরা জ্ঞানের সব উৎস পাই। দর্শনের বিষয়বস্তুর মধ্যে প্রমাণের এক বিশিষ্ট স্থান রয়েছে। তা নিয়ে পরে বিস্তৃত আলোচনা হবে।
 .
(২) প্রমেয় : প্রমেয় হলো যথার্থ অনুভব বা জ্ঞানের বিষয়। ন্যায়মতে প্রমেয়ের জ্ঞান মোক্ষলাভের সহায়ক। প্রমেয় বা জ্ঞানের বিষয় বারোটি- আত্মা, শরীর, ইন্দ্রিয়ের বিষয় বা অর্থ, বুদ্ধি অর্থাৎ জ্ঞান বা উপলব্ধি, মন, প্রবৃত্তি বা ধর্ম ও অধর্ম, দোষ অর্থাৎ রাগ, প্রেত্যভাব অর্থাৎ পুনর্জন্ম, মোহ বা মৃত্যু, ফল অর্থাৎ কর্মজন্য সুখ-দুঃখের অনুভূতি, দুঃখ এবং অপবর্গ বা মোক্ষ। ন্যায়সূত্রে বলা হয়েছে-
‘আত্ম-শরীরেন্দ্রিয়ার্থ-বুদ্ধি-মনঃ-প্রবৃত্তি-
দোষ-প্রেত্যভাব-ফল-দুঃখাপবর্গাস্তু প্রমেয়ম্’। (ন্যায়সূত্র-১/১/৯)
অর্থাৎ : আত্মা, শরীর, ইন্দ্রিয়, অর্থ, বুদ্ধি, মন, প্রবৃত্তি, দোষ, প্রেত্যভাব, ফল, দুঃখ ও অপবর্গ অর্থাৎ এই দ্বাদশ প্রকার পদার্থই প্রমেয় পদার্থ।
.
এই প্রমেয় পদার্থগুলির প্রত্যেকটির লক্ষণ নির্দেশ করতে গিয়ে সূত্রকার ‘ন্যায়সূত্রে’ বলেছেন-  
‘ইচ্ছা-দ্বেষ-প্রযত্ন-সুখ-দুঃখ-জ্ঞানান্যাত্মনো লিঙ্গম্’। (ন্যায়সূত্র-১/১/১০)
‘চেষ্টেন্দ্রিয়ার্থাশ্রয়ঃ শরীরম্’। (ন্যায়সূত্র-১/১/১১)
‘ঘ্রাণরসনচক্ষুস্ত্বক্-শ্রোত্রাণীন্দ্রিয়াণি ভূতেভ্যঃ’। (ন্যায়সূত্র-১/১/১২)
‘পৃথিব্যাপস্তেজো বায়ুরাকাশমিতি ভূতানি’। (ন্যায়সূত্র-১/১/১৩)
‘গন্ধরসরূপস্পর্শশব্দাঃ পৃথিব্যাদিগুণাস্তদর্থাঃ’। (ন্যায়সূত্র-১/১/১৪)
‘বুদ্ধিরুপলব্ধির্জ্ঞানমিত্যনর্থান্তরম্’। (ন্যায়সূত্র-১/১/১৫)
‘যুগপজ্-জ্ঞানানুৎপত্তির্স্মনসো লিঙ্গম্’। (ন্যায়সূত্র-১/১/১৬)
‘প্রবৃত্তির্ব্বাগ্ বুদ্ধিশরীরারম্ভঃ’। (ন্যায়সূত্র-১/১/১৭)
‘প্রবর্ত্তনালক্ষণা দোষাঃ’। (ন্যায়সূত্র-১/১/১৮)
‘পুনরুৎপত্তিঃ প্রেত্যভাবঃ’। (ন্যায়সূত্র-১/১/১৯)
‘প্রবৃত্তিদোষজনিতোহর্থঃ ফলম্’। (ন্যায়সূত্র-১/১/২০)
‘বাধনালক্ষণং দুঃখম্’। (ন্যায়সূত্র-১/১/২১)
‘তদত্যন্তবিমোক্ষোহপবর্গঃ’। (ন্যায়সূত্র-১/১/২২)
অর্থাৎ :
ইচ্ছা, দ্বেষ, প্রযত্ন, সুখ, দুঃখ ও জ্ঞান আত্মার লিঙ্গ অর্থাৎ দেহাদিভিন্ন চিরস্থায়ী জীবাত্মার অনুমাপক (ন্যায়সূত্র-১/১/১০)।  চেষ্টার আশ্রয়, ইন্দ্রিয়ের আশ্রয় এবং অর্থের (সুখ-দুঃখের) আশ্রয় শরীর (ন্যায়সূত্র-১/১/১১)।  ভূতবর্গজন্য অর্থাৎ যথাক্রমে পৃথিব্যাদি পঞ্চভূতমুলক ঘ্রাণ, রসন, চক্ষুঃ, ত্বক ও শ্রোত্র হলো ইন্দ্রিয় (ন্যায়সূত্র-১/১/১২)।  ক্ষিতি, জল, তেজ, বায়ু, আকাশ, এই পঞ্চদ্রব্য ভূতবর্গ (ন্যায়সূত্র-১/১/১৩)।  পৃথিব্যাদির গুণ (পূর্বোক্ত পঞ্চভূতের গুণ) গন্ধ, রস, রূপ, স্পর্শ ও শব্দ হলো ‘তদর্থ’ বা ইন্দ্রিয়ার্থ (ন্যায়সূত্র-১/১/১৪)।  বুদ্ধি, উপলব্ধি, জ্ঞান এগুলি অর্থান্তর নয়, অর্থাৎ একই পদার্থ (ন্যায়সূত্র-১/১/১৫)।  একই সময়ে জ্ঞানের অর্থাৎ বিজাতীয় নানা প্রত্যক্ষের অনুৎপত্তি বা উৎপত্তি না হওয়াই মনের লিঙ্গ বা অনুমাপক। যার সংযোগের অভাবে অন্য ইন্দ্রিয়জন্য প্রত্যক্ষ জন্মে না তাই হলো মন (ন্যায়সূত্র-১/১/১৬)।  বাচিক, মানসিক ও শারীরিক শুভাশুভ কর্মই প্রবৃত্তি (ন্যায়সূত্র-১/১/১৭)।  প্রবৃত্তিজনকত্ব যাদের লক্ষণ এবং অনুমাপক, সেই সমস্ত হলো দোষ অর্থাৎ রাগ, দ্বেষ ও মোহ (ন্যায়সূত্র-১/১/১৮)।  পুনরুৎপত্তি অর্থাৎ মৃত্যুর পরে পুনর্জন্ম হচ্ছে প্রেত্যভাব (ন্যায়সূত্র-১/১/১৯)।  প্রবৃত্তি এবং দোষ-জনিত পদার্থ (সুখ-দুঃখের অনুভব) হচ্ছে ফল (ন্যায়সূত্র-১/১/২০)।  এই সমস্তই অর্থাৎ পূর্বোক্ত শরীর থেকে ফল পর্যন্ত সমস্ত প্রমেয়ই বাধনালক্ষণ অর্থাৎ দুঃখানুষক্ত দুঃখ (ন্যায়সূত্র-১/১/২১)।  তার সাথে (পূর্বোক্ত মুখ্য গৌণ সবধরনের দুঃখের সাথে) অত্যন্ত মুক্তি হচ্ছে মোক্ষ বা অপবর্গ (ন্যায়সূত্র-১/১/২২)।

 .
(৩) সংশয় বা সন্দেহ : সংশয় হলো একপ্রকার অনিশ্চিত জ্ঞান। কোনো বস্তু ঠিক কী হবে নির্ণয় করতে না পেরে বস্তুটির প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে মনে যে সন্দেহ হয় তাকে সংশয় বলে। একই সময়ে একই বস্তুতে পরস্পর বিরুদ্ধ ধর্ম বা গুণের উপস্থিতির জ্ঞান বা চিন্তা করা হলে তখনই সংশয় দেখা দেয়। যেমন- ‘এটি স্থানু অথবা পুরুষ’ এরূপ জ্ঞান। তাই অনিশ্চিত জ্ঞানই হলো সংশয়। এই সংশয় বা সন্দেহ প্রসঙ্গে ‘ন্যায়সূত্রে’ বলা হয়েছে-  
‘সমানানেক ধর্ম্মোপপত্তেঃ র্ব্বিপ্রতিপত্তেঃ উপলব্ধ্যনুপলব্ধঃ অব্যবস্থাতশ্চ বিশেষাপেক্ষো বিমর্শঃ সংশয়ঃ’। (ন্যায়সূত্র-১/১/২৩)
অর্থাৎ : সাধারণ ধর্মবিশিষ্ট ধর্মীর জ্ঞানজন্য, অসাধারণ ধর্মবিশিষ্ট ধর্মীর জ্ঞানজন্য, বিপ্রতিপত্তিজন্য অর্থাৎ এক পদার্থে বিরুদ্ধার্থ-প্রতিপাদক বাক্যজন্য, উপলব্ধির অব্যবস্থাজন্য, এবং অনুপলব্ধির অব্যবস্থাজন্য ‘বিশেষাপেক্ষ’ অর্থাৎ যাতে পূর্বে বিশেষ ধর্মের উপলব্ধি হয় না, কিন্তু বিশেষ ধর্মের স্মৃতি আবশ্যক, এমন ‘বিমর্শ’ অর্থাৎ একই পদার্থে নানা বিরুদ্ধ পদার্থের জ্ঞান হচ্ছে সংশয়।

 .
(৪) প্রয়োজন : মানুষ যখন কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে কর্মে প্রবৃত্ত হয় তাকেই প্রয়োজন বলা হয়। প্রয়োজন হলো সেই উদ্দেশ্য যা লাভ বা পরিহারের জন্য মানুষকে প্রবৃত্ত করায়। আমরা কোনো বাঞ্ছনীয় বিষয়কে পাওয়ার জন্য কাজ করি অথবা অবাঞ্ছনীয় জিনিস থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য কাজ করি। এই দুটোই হলো আমাদের কর্মের উদ্দেশ্য। এই দুই ধরনের কর্মে প্রবৃত্ত হওয়াকে প্রয়োজন বলা হয়। এককথায়, প্রয়োজন হলো সুখপ্রাপ্তি ও দুঃখের বিনাশ। ন্যায়সূত্রে বলা হয়েছে-  
‘যমর্থমধিকৃত্য প্রবর্ত্ততে তৎ প্রয়োজনম্’। (ন্যায়সূত্র-১/১/২৪)
অর্থাৎ : যে পদার্থকে অধিকার করে অর্থাৎ গ্রাহ্য বা ত্যাজ্যরূপে নিশ্চয় করে (জীব) প্রবৃত্ত হয়, তা-ই প্রয়োজন।
 .
(৫) দৃষ্টান্ত : দৃষ্টান্ত হলো প্রমাণসিদ্ধ উদাহরণ। যার সম্বন্ধে কোনো মতভেদ থাকে না, বাদী ও প্রতিবাদী উভয়ই যা স্বীকার করে নেয় তাকে দৃষ্টান্ত বলে। যেমন, কোনো জায়গায় ধূম দেখে যদি সিদ্ধান্তে আসে যে ‘সেখানে আগুন আছে’, তখন দৃষ্টান্ত হিসেবে জ্বলন্ত চুল্লির উদাহরণ উল্লেখ করা যেতে পারে; কারণ জ্বলন্ত চুল্লিতে ধূম ও অগ্নির সহাবস্থান সকলেই জানেন। অর্থাৎ, দৃষ্টান্ত হলো অনুমানের সহায়ক ব্যাপ্তি সম্বন্ধের সমর্থসূচক বস্তু, যেমন পাকশালা। এ সম্বন্ধে সূত্রকার বলেছেন-
‘লৌকিকপরীক্ষকাণাং যস্মিন্নর্থে বুদ্ধিসাম্যং স দৃষ্টান্তঃ’। (ন্যায়সূত্র-১/১/২৫)
অর্থাৎ : লৌকিকদের এবং পরীক্ষকদের যে পদার্থে বুদ্ধির সাম্য (অবিরোধ) হয়, তা দৃষ্টান্ত।

 .
(৬) সিদ্ধান্ত : সিদ্ধান্ত হলো কোনো বিষয় সম্পর্কে শাস্ত্রের প্রতিপাদ্য ও প্রতিষ্ঠিত মতবাদ। যেমন ন্যায়দর্শনের একটি সিদ্ধান্ত হলো- আত্মা এক প্রকার দ্রব্য যেখান থেকে চেতনাগুণকে আলাদা করা যায় অর্থাৎ চৈতন্য আত্মার আগন্তুক গুণ। সহজ কথায়, সিদ্ধান্ত হলো কোন কিছু যা প্রমাণের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। ন্যায়সূত্রে বলা হয়েছে-  
‘তন্ত্রাধিকরণাভ্যূপগমসং স্থিতিঃ সিদ্ধান্তঃ’। (ন্যায়সূত্র-১/১/২৬)
অর্থাৎ : তন্ত্রাধিকরণের অর্থাৎ প্রমাণবোধিত পদার্থসমূহের স্বীকার-সংস্থিতি হচ্ছে সিদ্ধান্ত।
.
এই সিদ্ধান্ত পদার্থ চারপ্রকার। ন্যায়সূত্রে এ সম্বন্ধে মহর্ষি বলেছেন-  
‘স চতুর্ব্বিধঃ সর্ব্বতন্ত্র-প্রতিতন্ত্রাদিকরণাভ্যুপগমসং স্থিত্যর্থান্তরভাবাৎ’। (ন্যায়সূত্র-১/১/২৭)
অর্থাৎ : কিন্তু তন্ত্রের ভেদপ্রযুক্ত সেই সিদ্ধান্ত পদার্থ চতুর্বিধ, যেহেতু- সর্বতন্ত্রসংস্থিতি, প্রতিতন্ত্রসংস্থিতি, অধিকরণসংস্থিতি ও অভ্যুপগমসংস্থিতির ‘অর্থান্তভাব’ (পরস্পর ভেদ) আছে।
.
তার মানে সিদ্ধান্ত চার প্রকার, যথা- সর্বতন্ত্রসিদ্ধান্ত, প্রতিতন্ত্রসিদ্ধান্ত, অধিকরণসিদ্ধান্ত ও অভ্যুপগমসিদ্ধান্ত।
সর্বতন্ত্রসিদ্ধান্তের লক্ষণ প্রকাশ করতে গিয়ে ন্যায়সূত্রকার বলেছেন-  
‘সর্ব্বতন্ত্রাবিরুদ্ধস্তন্ত্রেঃ অধিকৃতোহর্থঃ সর্ব্বতন্ত্রসিদ্ধান্তঃ’। (ন্যায়সূত্র-১/১/২৮)
অর্থাৎ : তারমধ্যে সর্বশাস্ত্রে অবিরুদ্ধ, শাস্ত্রে কথিত পদার্থ হলো সর্বতন্ত্রসিদ্ধান্ত।
.
ভাষ্যকার বাৎস্যায়ন সর্বতন্ত্রসিদ্ধান্ত বুঝাতে ‘ন্যায়ভাষ্যে’ উদাহরণ দিয়ে বলেছেন- ‘যেমন ঘ্রাণাদি ইন্দ্রিয়, গন্ধ প্রভৃতি ইন্দ্রিয়ার্থ, ক্ষিতি প্রভৃতি ভূত, প্রমাণের দ্বারা পদার্থের যথার্থ জ্ঞান হয়, ইত্যাদি সর্বতন্ত্রসিদ্ধান্ত’ (যথা ঘ্রাণাদীনীন্দ্রিয়াণি, গন্ধাদয় ইন্দ্রিয়ার্থাঃ, পৃথিব্যাদীনি ভূতানি, প্রমাণৈরর্থস্য গ্রহণমিতি)।
প্রতিতন্ত্রসিদ্ধান্তের লক্ষণে ন্যায়সূত্রকার বলেছেন-  
‘সমানতন্ত্রসিদ্ধঃ পরতন্ত্রাসিদ্ধঃ প্রতিতন্ত্রসিদ্ধান্তঃ’। (ন্যায়সূত্র-১/১/২৯)
অর্থাৎ : সমানতন্ত্রসিদ্ধ অর্থাৎ একশাস্ত্র বা স্বশাস্ত্রসিদ্ধ, (কিন্তু) পরতন্ত্রে (অন্য শাস্ত্রে) অসিদ্ধ (পদার্থ) হচ্ছে প্রতিতন্ত্রসিদ্ধান্ত।
.
যেমন কিছু সিদ্ধান্ত আছে যা সমানতন্ত্র হিসেবে ন্যায় ও বৈশেষিক দর্শনে সিদ্ধান্ত করা হয় যা অন্য দর্শনে অস্বীকৃত। একইভাবে সাংখ্য ও যোগ সমানতন্ত্র শাস্ত্র, মীমাংসা ও বেদান্ত সমানতন্ত্র শাস্ত্র, ফলে এগুলির মধ্যে মৌলিক কিছু সিদ্ধান্তে মতপার্থক্য থাকলেও বেশ কিছু সিদ্ধান্ত সমানতান্ত্রিক।
এরপর অধিকরণসিদ্ধান্তের লক্ষণে সূত্রকার বলেছেন-  
‘যৎসিদ্ধাবন্যপ্রকরণসিদ্ধঃ সোহধিকরণসিদ্ধান্তঃ’। (ন্যায়সূত্র-১/১/৩০)
অর্থাৎ : যে পদার্থের সিদ্ধিবিষয়ে অন্য ‘প্রকরণে’র অর্থাৎ অন্য আনুষঙ্গিক পদার্থের সিদ্ধি হয়, সেই পদার্থ হলো অধিকরণসিদ্ধান্ত।
.
যেমন বৃত্তিকার বিশ্বনাথ জগৎকর্তার সর্বজ্ঞত্বকে অধিকরণসিদ্ধান্ত বলেছেন। কারণ, জগৎকর্তার সর্বজ্ঞত্ব ছাড়া সৃষ্টির প্রথমে উৎপদ দ্ব্যণুকাদির সকর্তৃকত্ব সিদ্ধ হয় না। যে পদার্থ ব্যতীত যা সিদ্ধ হয় না, সেই পদার্থই তার সিদ্ধিতে ‘অনুষঙ্গী’ পদার্থ। নৈয়ায়িক উদ্দ্যোতকর প্রভৃতি সেই অনুষঙ্গী পদার্থকেই অধিকরণসিদ্ধান্ত বলেছেন।
অতঃপর অভ্যুপগমসিদ্ধান্তের লক্ষণে সূত্রকার বলেছেন-  
‘অপরীক্ষিতাভ্যূপগমাৎ তদ্বিশেষপরীক্ষণম্ অভ্যুপগমসিদ্ধান্তঃ’। (ন্যায়সূত্র-১/১/৩১)
অর্থাৎ : (যে স্থলে) অপরীক্ষিত পদার্থের স্বীকারপ্রযুক্ত অর্থাৎ প্রমাণাদির দ্বারা বিচারপূর্বক অনির্ণীত কোন পরসিদ্ধান্তের (আপাত) স্বীকার করে যখন সেই ধর্মীর বিশেষধর্মের পরীক্ষা অর্থাৎ বিচার করা হয়, (সেই স্থলে সেই স্বীকৃত পরসিদ্ধান্ত) হচ্ছে অভ্যুপগমসিদ্ধান্ত।

অভ্যুপগমসিদ্ধান্ত বুঝাতে গিয়ে ভাষ্যকার বাৎস্যায়নের ব্যাখ্যানুসারে, যে স্থলে প্রতিবাদী নিজের অসম্মত কোন সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়েই কোন পদার্থের বিশেষ ধর্মের পরীক্ষা বা বিচার করেন, সেই স্থলে তাঁর আপাত স্বীকৃত সেই পরসিদ্ধান্তই তাঁর পক্ষে অভ্যুপগমসিদ্ধান্ত। যেমন, কোন বাদী শব্দকে নিত্য ও দ্রব্যপদার্থ বললে, তখন প্রতিবাদী নৈয়ায়িক যদি বলেন যে, আচ্ছা, শব্দ দ্রব্যপদার্থই হোক, কিন্তু তা নিত্য অথবা অনিত্য, সেটি পরীক্ষণীয়। এভাবে নৈয়ায়িক শব্দের দ্রব্যত্ব মেনে নিয়েই তার বিশেষ ধর্ম নিত্যত্ব ও অনিত্যত্ব বিষয় বিচার করলে সেই স্থলে তাঁর স্বীকৃত ঐ পরসিদ্ধান্ত তাঁর পক্ষে ‘অভ্যুপগম-সিদ্ধান্ত’।
 .
(৭) অবয়ব : অবয়ব হলো ন্যায়দর্শন স্বীকৃত পরার্থানুমান বা অনুমানের অন্তর্গত যে-কোনো একটি অঙ্গ। পরার্থানুমানের পাঁচটি অবয়ব। অবয়ব প্রসঙ্গে ন্যায়সূত্রে বলা হয়েছে-  
‘প্রতিজ্ঞাহেতূদাহরণোপনয়নিগমনান্ অবয়বাঃ’। (ন্যায়সূত্র-১/১/৩২)
অর্থাৎ : প্রতিজ্ঞা, হেতু, উদাহরণ, উপনয় ও নিগমন- এই পঞ্চবাক্য অবয়ব।
প্রতিজ্ঞা, হেতু, উদাহরণ, উপনয় ও নিগমন- এই পাঁচটি বাক্যকে ন্যায়ের অবয়ব বলা হয়। উদাহরণস্বরূপ-
১. পর্বত বহ্নিমান (প্রতিজ্ঞা)
২. কারণ পর্বত ধূমায়মান (হেতু)
৩. যেখানে ধূম সেখানে বহ্নি (উদাহরণ)
৪. পর্বত ধূমায়মান (উপনয়)
৫. সুতরাং পর্বত বহ্নিমান (নিগমন) 
অবয়ব নিয়ে পরে ভিন্নভাবে আলোচনা করা হয়েছে।
 ..
(৮) তর্ক : তর্ক হলো এমন এক প্রাকল্পিক যুক্তি (a hypothetical argument) যা কোনো স্বীকৃত সিদ্ধান্তের বিপরীত বক্তব্যকে অসম্ভব প্রমাণ করার জন্য প্রদর্শন করা হয় এবং তার দ্বারা পরোক্ষভাবে মূল সিদ্ধান্তের সত্যতা প্রমাণ করা হয়। যেমন- পর্বতে ধূম থাকলেও কেউ যদি পর্বতে অগ্নির অস্তিত্ব অস্বীকার করে, সেক্ষেত্রে নৈয়ায়িকরা এরূপ তর্ক প্রয়োগ করেন যে ‘যদি অগ্নি না থাকে তাহলে ধূম অগ্নিজন্য না হোক্’। তর্কের সংজ্ঞায় ন্যায়সূত্রে বলা হয়েছে-  
‘অবিজ্ঞাত-তত্ত্বেহর্থে কারণোপপত্তিতস্তত্ত্বজ্ঞানার্থম্ ঊহঃ তর্কঃ’। (ন্যায়সূত্র-১/১/৪০)
অর্থাৎ : ‘অবিজ্ঞাততত্ত্ব’ পদার্থে অর্থাৎ সামান্যতঃ জ্ঞাত যে পদার্থের তত্ত্ব অবিজ্ঞাত, এমন পদার্থ বিষয়ে তত্ত্বজ্ঞানের নিমিত্ত, কারণের উপপত্তি অর্থাৎ প্রমাণের সম্ভবপ্রযুক্ত ‘ঊহ’ (জ্ঞানবিশেষ) হচ্ছে তর্ক।
.
তর্ক প্রসঙ্গে উদয়নাচার্য্যরে মতানুসারেই বরদরাজ তাঁর ‘তার্কিকরক্ষা’য় বলেছেন-  
‘তর্কোহনিষ্টপ্রসঙ্গঃ স্যাদনিষ্টং দ্বিবিধং স্মৃতং।
প্রামাণিকপরিত্যাগস্তথেতরপরিগ্রহঃ।।’- (তার্কিকরক্ষা)
অর্থাৎ : অনিষ্টের প্রসঙ্গ বা আপত্তিই তর্ক। সেই অনিষ্ট প্রামাণিক পদার্থের পরিত্যাগ এবং অপ্রামাণিক পদার্থের স্বীকার।
.
যেমন ‘জলপান পিপাসার নিবর্তক নয়’ একথা বললে আপত্তি হয় যে, তাহলে পিপাসু ব্যক্তিরা জল পান না করুক? মহানৈয়ায়িক উদয়নাচার্য্যরে মতে ‘তর্ক’পদার্থ পঞ্চবিধ-  আত্মাশ্রয়, ইতরেতরাশ্রয়, চক্রকাশ্রয়, অনবস্থা ও অনিষ্টপ্রসঙ্গ তর্ক।
কোন পদার্থ নিজের উৎপত্তি অথবা স্থিতি অথবা জ্ঞানে অব্যবধানে নিজেকে অপেক্ষা করলে একারণে যে অনিষ্টাপত্তি হয়, তাকে বলে ‘আত্মাশ্রয়’। আর সেই পদার্থ অপর একটি পদার্থকে অপেক্ষা করে আবার নিজেকেই অপেক্ষা করলে সেকারণে যে অনিষ্টাপত্তি হয়, তাকে বলে ‘ইতরেতরাশ্রয়’ বা ‘অন্যোন্যাশ্রয়’। এইরূপ অপর দুটি পদার্থ বা ততোধিক পদার্থকে অপেক্ষা করে আবার নিজেকেই অপেক্ষা করলে তার ফলে যে অনিষ্টাপত্তি হয়, তাকে বলে ‘চক্রকাশ্রয়’। আর যে আপত্তির কোথাও বিশ্রাম বা শেষ নেই, এমন যে ধারাবাহিক আপত্তি, তাকে বলে ‘অনবস্থা’। এভাবে অনন্ত আপত্তিমূলক যে অনিষ্টাপত্তি হয়, তাও ‘অনবস্থা’ নামে কথিত হয়েছে। কিন্তু কোন স্থলে ঐরূপ আপত্তি সর্বমতে প্রমাণসিদ্ধ হলে তা ‘অনবস্থা’রূপ তর্ক হবে না। কারণ, সেরূপ স্থলে সেটি সকল মতেই ইষ্টাপত্তি। এই চারপ্রকার তর্ক ছাড়া বাকি সমস্ত তর্কই ‘অনিষ্টপ্রসঙ্গ’ নামে পঞ্চম প্রকার তর্ক।
 .
(৯) নির্ণয় : নির্ণয় হলো এমন এক যুক্তি যার সাহায্যে এক পক্ষের মতকে বর্জন করে অপর পক্ষের মতকে গ্রহণ করা হয়। পরস্পরবিরোধী মতবাদ বিচার করে একটিকে বর্জন করে অপরটিকে গ্রহণ করার নাম নির্ণয়। সোজা কথায়, নির্ণয় হলো স্বীকৃত প্রমাণের দ্বারা একটি বিষয়ের নিশ্চয়তা। ন্যায়সূত্রে বলা হয়েছে-  
‘বিমৃশ্য পক্ষপ্রতিপক্ষাভ্যামর্থ অবধারণং নির্ণয়ঃ’। (ন্যায়সূত্র-১/১/৪১)
অর্থাৎ : তর্কবিষয়ে অর্থাৎ পূর্বোক্ত তর্কস্থলে- সংশয় করে পক্ষ ও প্রতিপক্ষের দ্বারা অর্থাৎ স্বপক্ষের সংস্থাপন এবং পরপক্ষের সাধনের খন্ডনের দ্বারা পদার্থের অবধারণ হচ্ছে নির্ণয়।
 .
(১০) বাদ : বাদ হলো তত্ত্বকে জানার জন্য একপ্রকার কথা বা আলোচনা। প্রমাণ ও তর্কের দ্বারা তত্ত্বনির্ণয়ের উদ্দেশ্যে আলোচনাকেই বাদ বলা হয়। যেমন আত্মার অস্তিত্ব আছে আবার নেই, দুটো সিদ্ধান্তই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এরূপ ক্ষেত্রে আত্মার যথার্থ স্বরূপ নির্ণয় করার জন্য যে আলোচনা তাই হলো বাদ। গুরু-শিষ্যের দার্শনিক আলোচনা বাদ-এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বাদ প্রসঙ্গে ন্যায়সূত্রে বলা হয়েছে-  
‘প্রমাণ-তর্ক-সাধনোপালম্ভঃ সিদ্ধাস্তাবিরুদ্ধঃ পঞ্চাবয়বোপপন্নঃ পক্ষপ্রতিপক্ষপরিগ্রহো বাদঃ’। (ন্যায়সূত্র-১/২/৪২)
অর্থাৎ : যাতে প্রমাণ ও তর্কের দ্বারা ‘সাধন’ (স্বপক্ষস্থাপন) এবং ‘উপালম্ভ’ (পরপক্ষখণ্ডন) হয়, এমন ‘সিদ্ধান্তবিরুদ্ধ’ ও পঞ্চাবয়বযুক্ত ‘পক্ষপ্রতিপক্ষ-পরিগ্রহ’ অর্থাৎ যাতে বাদী ও প্রতিবাদীর স্বীকৃত বিরুদ্ধ-ধর্মদ্বয়রূপ পক্ষ ও প্রতিপক্ষের পরিগ্রহ হয়, এমন বাক্যসমূহ হচ্ছে ‘বাদ’।
 .
(১১) জল্প : কোন তত্ত্বনির্ণয়ের প্রতি লক্ষ্য না রেখে কেবলমাত্র প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করার জন্য যে নিছক বাক্-যুদ্ধ চলে, তাকেই বলা হয় জল্প। জল্পের প্রধান উদ্দেশ্য হলো আত্মপক্ষ সমর্থন। এখানে শাস্ত্রনীতি লঙ্ঘন করা হয়ে থাকে। সোজা কথায়, জল্প সেই আলোচনা যার লক্ষ্য তত্ত্বজ্ঞান নয়, যার একমাত্র লক্ষ্য জয়লাভ করা। ন্যায়সূত্রে জল্প প্রসঙ্গে বলা হয়েছে-  
‘যথোক্তোপপন্নশ্ছল-জাতি-নিগ্রহস্থান-সাধনোপালম্ভো জল্পঃ’। (ন্যায়সূত্র-১/২/৪৩)
অর্থাৎ : পূর্বসূত্রে বাদের লক্ষণে কথিত সমস্ত বিশেষণবিশিষ্ট হয়ে ‘ছল’, ‘জাতি’ ও সমস্ত ‘নিগ্রহস্থানে’র দ্বারা যাতে সাধন ও উপালম্ভ (পরপক্ষখণ্ডন) করা যায়, তা হচ্ছে জল্প।
 .
(১২) বিতণ্ডা : বিতণ্ডা হলো একপ্রকার যুক্তিহীন তর্ক। এক্ষেত্রে কোন পক্ষই নিজের মত প্রতিষ্ঠা না করে অপরের মতকে খণ্ডন করার চেষ্টা করে। অর্থাৎ, বিতণ্ডা হলো একপ্রকার আলোচনা যার লক্ষ্য তত্ত্বজ্ঞান নয়, জয়লাভ করাও নয়, যার একমাত্র লক্ষ্য প্রতিপক্ষকে খণ্ডন করা। ন্যায়সূত্রে বলা হয়েছে-  
‘স প্রতিপক্ষস্থাপনাহীনো বিতণ্ডা’। (ন্যায়সূত্র-১/২/৪৪)
অর্থাৎ : সেই জল্প, প্রতিপক্ষের স্থাপনাশূন্য হলে বিতণ্ডা হয়।

 .
(১৩) হেত্বাভাস : হেত্বাভাস অনুমান সংক্রান্ত অনুপপত্তি বা অনুমানের হেতু সংক্রান্ত দোষ। যে হেতুতে সৎ হেতুর লক্ষণের কোন একটির অভাব থাকে সেটিই অসৎ হেতু বা হেত্বাভাস দোষদুষ্ট হেতু। আসলে হেতু নয় অথচ হেতুর আভাস বা হেতুর মতো দেখায় তাকে হেত্বাভাস বলে। হেত্বাভাসের লক্ষণে ভাষ্যকার বাৎস্যায়ন তাঁর ‘ন্যায়ভাষ্যে’ বলেছেন-  
‘হেতুলক্ষণাভাবাদহেতবো হেতুসামান্যাৎ হেতুবদাভাসমানাঃ’। (ন্যায়ভাষ্য)
অর্থাৎ : হেতুর সমস্ত লক্ষণ না থাকায় অহেতু অর্থাৎ প্রকৃত হেতু নয়, এবং হেতুর সামান্য বা সাদৃশ্য থাকায় হেতুর ন্যায় প্রকাশমান, এটাই ‘হেত্বাভাস’ শব্দের অর্থ।
.
হেত্বাভাস পাঁচপ্রকার। এ প্রসঙ্গে ন্যায়সূত্রকার বলেছেন-  
‘সব্যভিচার-বিরুদ্ধ-প্রকরণসম-সাধ্যসম-কালাতীতা হেত্বাভাসাঃ’। (ন্যায়সূত্র-১/২/৪৫)
অর্থাৎ : এসব লক্ষণাক্রান্ত হেত্বাভাস পাঁচপ্রকার- সব্যভিচার, বিরুদ্ধ, প্রকরণসম, সাধ্যসম ও কালাতীত।  
.
গুরুত্ব বিবেচনায় হেত্বাভাস নিয়ে ভিন্নভাবে আলোচনার অপেক্ষা রাখে।
 .
(১৪) ছল : বক্তা যে অর্থে একটি শব্দ বা বাক্য প্রয়োগ করেন, প্রতিপক্ষ যদি সেই শব্দ বা বাক্যের অন্য অর্থ কল্পনা করে বক্তার বক্তব্যের দোষ দেখান, তাহলে তাকে বলা হয় ছল। ছলে দেখা যায় যে, বাদী বা বক্তা এক অর্থে একটি শব্দ ব্যবহার করে কিন্তু প্রতিপক্ষ শব্দটি দ্ব্যর্থবোধক হওয়ার জন্য শব্দটিকে অন্য অর্থে গ্রহণ করে। বাক চাতুরী দ্বারা প্রতিপক্ষের বাক্যের দোষ দেখানো হলো ছল। যেমন ‘দণ্ড’ কথাটি সময়ের অংশ এই অর্থে বাদী বললো যে- ‘দণ্ড’ হলো ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু ‘দণ্ড’ শব্দটির আরেকটি অর্থ হলো ‘শাস্তি’। প্রতিপক্ষ বিপরীত অর্থ কল্পনা করে ছল করলেন। সোজা কথায়, ছল হলো একটি বাক্যের অভিপ্রেত অর্থ থেকে ভিন্ন অর্থ গ্রহণ করে ঐ বাক্যের খণ্ডন (দূষণ)। ন্যায়সূত্রে বলা হয়েছে-  
‘বচনবিঘাতোহর্থাবকল্পোপপত্ত্যা ছলং’। (ন্যায়সূত্র-১/২/৫১)
অর্থাৎ : ‘অর্থবিকল্প’- অর্থাৎ বাদীর অভিমত অর্থের বিরুদ্ধার্থ-কল্পনারূপ উপপত্তির দ্বারা (বাদীর) বচনের বিঘাত হচ্ছে ছল।
.
ন্যায়সূত্রে বলা হয়েছে, ছল তিনপ্রকার- বাক্-ছল, সামান্য ছল এবং উপচার ছল।
‘তৎ ত্রিবিধং–বাক্ছলং সামান্যচ্ছলম্ উপাচারচ্ছলঞ্চ’। (ন্যায়সূত্র-১/২/৫২)
অর্থাৎ : ছল ত্রিবিধ- বাক্-ছল, সামান্যছল ও উপচারছল।
.
এই তিনপ্রকার ছলের লক্ষণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ন্যায়সূত্রকার বলেছেন-  
‘অবিশেষাহিতেহর্থে বক্তুরভিপ্রায়াৎ অর্থান্তরকল্পনা বাক্চ্ছলম্’। (ন্যায়সূত্র-১/২/৫৩)
‘সম্ভবতোহর্থস্য অতিসামান্যযোগাৎ অসম্ভূতার্থকল্পনা সামান্যচ্ছলম্’। (ন্যায়সূত্র-১/২/৫৪)
‘ধর্ম্মবিকল্প-নির্দ্দেশেহর্থ-সদ্ভাব-প্রতিষেধ উপচারচ্ছলম্’। (ন্যায়সূত্র-১/২/৫৫)
অর্থাৎ :
সেই ত্রিবিধ ছলের মধ্যে অবিশেষে উক্ত হলে অর্থাৎ দ্ব্যর্থ বোধক সমান শব্দ প্রয়োগ করলে অর্থ বিষয়ে বক্তার অভিপ্রেত অর্থ থেকে ভিন্ন অর্থের কল্পনা বা ঐরূপ অর্থান্তরকল্পনার দ্বারা যে দোষপ্রদর্শন, তা বাক্ছল (ন্যায়সূত্র-১/২/৫৩)। সম্ভাব্যমান পদার্থের সম্বন্ধে অতি সামান্য ধর্মের যোগবশত অর্থাৎ যে সামান্য ধর্মটি বক্তার উদ্দিষ্ট পদার্থকে অতিক্রম করে অন্যত্রও থাকে, সেরূপ সামান্য ধর্মের সম্বন্ধবশত অসম্ভব অর্থের যে কল্পনা বা সেই কল্পনার দ্বারা যে প্রতিষেধ, তা সামান্যছল (ন্যায়সূত্র-১/২/৫৪)।  ধর্মবিকল্পের নির্দেশ হলে অর্থাৎ কোন শব্দের লাক্ষণিক বা গৌণ অর্থে প্রয়োগ হলে অর্থসদ্ভাবের দ্বারা যে প্রতিষেধ, অর্থাৎ মুখ্যার্থ অবলম্বন করে যে দোষ প্রদর্শন, তা উপচারছল (ন্যায়সূত্র-১/২/৫৫)।
 
(১৫) জাতি : ব্যাপ্তির উপর নির্ভর না করে শুধুমাত্র সাদৃশ্য (similarity) বা বৈসাদৃশ্যের (dissimilarity) উপর ভিত্তি করে যখন কোনো অপ্রাসঙ্গিক যুক্তি উপস্থাপন করা হয় তখন তাকে জাতি বলে। যদি কেউ যুক্তি দেখায় যে ‘শব্দ অনিত্য’ কারণ ঘট-পটাদির মতো উৎপত্তিশীল। বক্তার এই সিদ্ধান্তকে খণ্ডন করার জন্য প্রতিপক্ষ বলেন ‘শব্দ নিত্য’ কারণ এ আকাশের মতো অমূর্ত। এখানে নিত্যত্ব এবং অমূর্তত্বের মধ্যে কোনো ব্যাপ্তি সম্পর্ক নেই। প্রতিপক্ষের এ যুক্তির নাম জাতি। অর্থাৎ, জাতি হলো মিথ্যা সাদৃশ্য বা বৈসাদৃশ্যের ভিত্তিতে অযথার্থ উত্তর প্রদান। ন্যায়সূত্রে বলা হয়েছ-  
‘সাধর্ম্ম্য-বৈধর্ম্ম্যাভ্যাং প্রত্যবস্থানং জাতিঃ’। (ন্যায়সূত্র-১/২/৫৯)
অর্থাৎ : সাধর্ম্য ও বৈধর্ম্যরে দ্বারা অর্থাৎ কেবল কোন সাধর্ম্য অথবা কোন বৈধর্ম্য গ্রহণ করে তার দ্বারা ‘প্রত্যবস্থান’ (প্রতিষেধ) হলো জাতি।

জাতি অষ্টাদশ (মতান্তরে চব্বিশ) রকমের, যথা- সাধর্ম্যসমা, বৈধর্ম্যসমা, উৎকর্ষসমা, অপকর্ষসমা, বর্ণ্যসমা, অবর্ণ্যসমা, বিকল্পসমা, সাধ্যসমা, প্রাপ্তিসমা, অপ্রাপ্তিসমা, প্রসঙ্গসমা, প্রতিদৃষ্টান্তসমা, অনুৎপত্তিসমা, উৎপত্তিসমা, উপলব্ধিসমা, নিত্যসমা, অনিত্যসমা এবং কার্যসমা।
 .
(১৬) নিগ্রহস্থান : নিগ্রহের অর্থ বিতর্কে পরাজয়ের হেতু বা কারণ। যদি যুক্তির দ্বারা খণ্ডন করতে না পারে বা প্রতিপক্ষের নিজ মত খণ্ডিত হওয়ার ফলে তাকে যুক্তি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত করতে না পারে তবে সে কারণ হবে নিগ্রহস্থান। ন্যায়সূত্রকার বলেছেন-  
‘বিপ্রতিপত্তিরপ্রতিপত্তিশ্চ নিগ্রহস্থানম্’। (ন্যায়সূত্র-১/২/৬০)
অর্থাৎ : বিপ্রতিপত্তি অর্থাৎ বিপরীত জ্ঞান এবং কুৎসিত জ্ঞান; আর অপ্রতিপত্তি অর্থাৎ অজ্ঞতাবিশেষ নিগ্রহস্থান। অর্থাৎ যার দ্বারা বাদী বা প্রতিবাদীর বিপ্রতিপত্তি অথবা অপ্রতিপত্তি বুঝা যায়, তাকে নিগ্রহস্থান বলে।

নিগ্রহস্থান বাইশ (মতান্তরে চব্বিশ) প্রকারের। যেমন- প্রতিজ্ঞাহানি, প্রতিজ্ঞান্তর, প্রতিজ্ঞাবিরোধ, প্রতিজ্ঞাসন্ন্যাস, হেত্বান্তর, অর্থান্তর, নিরর্থক, অবিজ্ঞাতার্থক, অপার্থক, অপ্রাপ্তকাল, ন্যূন, অধিক, পুনরুক্ত, অননুভাষণ, অজ্ঞান, অপ্রতিভা, বিক্ষেপ, মতানুজ্ঞা, পর্যনুযোজ্যোপেক্ষণ, নিরনুযোজ্যোনুযোগ, অপসিদ্ধান্ত এবং হেত্বাভাস।
বিচারে পরাজয়ের কারণ নানাভাবে হতে পারে। ভ্রমাত্মক জ্ঞান অথবা অজ্ঞানতাই পরাজয়ের কারণ।
নবীনতর পূর্বতন

نموذج الاتصال